নবম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা হল কবি অজিত দত্তের নোঙর কবিতা । আমরা এর আগে হিমালয় দর্শন প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করেছি। অন্যান্য পাঠ্য রচনা নবম শ্রেণি বাংলা প্রশ্ন উত্তর তোমাদের স্বার্থে দেওয়া হয়েছে। আজকের আলোচ্য কবিতা থেকেও তোমাদের প্রাসঙ্গিক নানা তথ্য ও প্রশ্নোত্তর পরিবেশিত হল। পুরোটা পড়ো এবং প্রয়োজনীয় তথ্যগুলি খাতায় নোট করে নিতে পারো।
নোঙর কবিতা – প্রাসঙ্গিক তথ্য
কবিতার উৎস – ‘শাদা মেঘ কালো পাহাড়’ কাব্যগ্রন্থ
কবিতার ধরন – রূপকধর্মী
বিষয়বস্তু
নোঙর কবিতাটি প্রতীকধর্মী। এই কবিতায় ফুটে উঠেছে জীবনের আশা ও ব্যর্থতার কথা। কবি বাস্তব জীবনের সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্তি নিয়ে পাড়ি দিতে চান অজানার দেশে। কিন্তু নোঙরের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাস্তব। কবি সারা জীবন মিছে দাঁড় টানেন।
‘নোঙর’ কবিতায় কবি অজিত দত্তের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছানোর অভীপ্সা প্রকাশিত হয়েছে। সংসার ও পারিপার্শ্বিক বন্ধনের সীমানা পেরিয়ে তিনি চলে যেতে চান দূর সিন্ধুপারে। তিনি নৌকা প্রস্তুত রেখেছেন। সেই নৌকায় সঞ্চয় বোঝাই করেছেন, মাস্তুলে পাল বেঁধেছেন, হাতে ধরেছেন দাঁড়। কিন্তু তিনি সামনে এগোতে পারছেন না। কারণ, অজান্তে তটের কিনারে নোঙর পড়ে গেছে।
আসলে কবির সুদূরপিয়াসী মন বাঁধা পড়ে গেছে অদৃশ্য জাগতিক বন্ধনে। কিন্তু জীবনের গতিশীলতার বিশ্বাসী কবি থেমে থাকতে চান না। তিনি অতিক্রম করতে চান সকল প্রতিবন্ধকতাকে। তাই তিনি অবিরত জীবনতরীর দাঁড় টানেন। তাঁর মন এই বন্ধনকে মানতে পারে না। তাই কবি সারারাত দাঁড় টানেন। কিন্তু তা মিছে হয়ে যায়।
জোয়ার-ভাটায় আবর্তিত এই জীবনের তটে কবি নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকেন। তাঁর চোখের সামনে দুরন্ত ঢেউগুলি গতির বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু সাড়া না পেয়ে পরক্ষণে আবার ফিরে যায়। চঞ্চল স্রোত কবির নিশ্চলতাকে বিদ্রুপ করে। এরপর নিস্তব্ধ রাতে কবি অবিরাম দাঁড় টেনে চলেন। বারবার ব্যর্থ হয়েও তিনি কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আশা ত্যাগ করেন না। তিনি দাঁড় টেনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এককথায় প্রশ্নোত্তর
১. ‘নোঙর’ কবিতাটির কবি কে ?
উঃ অজিত দত্ত
২. নোঙর কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া ?
উঃ শাদা মেঘ কালো পাহাড়
৩. ‘পাড়ি দিতে হবে দূর ——–‘ – শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ সিন্ধুপারে
৪. নোঙর কোথায় পড়ে গিয়েছে ?
উঃ তটের কিনারে
৫. কবি মিছে দাঁড় টানেন –
উঃ সারারাত
৬. কবির ভাষায় ‘জোয়ারের ঢেউগুলি’ যা করে ওঠে –
উঃ ফুলে ফুলে ওঠে
৭. জোয়ারের ঢেউগুলি কীসে মাথা ঠুকে সমুদ্রের দিকে ছোটে ?
উঃ তরীতে
৮. ‘তারপর ——– শোষণ’ – শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ ভাঁটার
৯. কবির বাণিজ্য-তরী কোথায় বাঁধা পড়ে আছে ?
উঃ তটের কাছে
১০. নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি কীসের আওয়াজে কেঁপে ওঠে ?
উঃ সাগর গর্জনে
১১. কবি কখন স্রোতের বিদ্রুপ শুনতে পান ?
উঃ যখন দাঁড় নিক্ষেপ করেন
১২. কবি কার দিকে চেয়ে দিকের নিশানা করেন ?
উঃ তারার দিকে চেয়ে
১৩. কবি তাঁর দাঁড় টানাকে কীভাবে উল্লেখ করেছেন ?
উঃ বিরামহীন
১৪. কবি কোথায় পাড়ি দিতে চান ?
উঃ সপ্তসিন্ধু পাড়ে
১৫. ‘সারারাত তবু দাঁড় টানি’ চরণটি কবিতার কোন স্তবকে পাওয়া যায় ?
উঃ দ্বিতীয় স্তবকে
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
১. ‘আমার বাণিজ্য তরী বাঁধা পড়ে আছে’ – কথাটির তাৎপর্য কী লেখো।
উঃ কবি নিজের লেখা রচনাসম্ভার নিয়ে ভেসে যেতে চান দূর কোনো স্থানে। সাতসমুদ্র পাড়ের সেই সুদূর জগতে কবি মেতে উঠতে চান তাঁর সৃষ্টিশীলতায়। সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে কবি চলে যেতে চান সেই কাঙ্খিত গন্তব্যে। এই আশা নিয়েই তিনি প্রতিদিন বুক বাঁধেন। কিন্তু, পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ে যায়, বাস্তব জীবন ও সংসারের দায়িত্ব কর্তব্য ত্যাগ করে তিনি কোনােদিনই গন্তব্যে যেতে পারবেন না । তাই গভীর হতাশার সাথে কবি আলােচ্য উক্তিটি করেছেন।
২. কবিতায় কবি ‘স্রোতের বিদ্রুপ’ বলতে কী বুঝিয়েছেন ?
উঃ কবি নৌকা নিয়ে পাড়ি দিতে চান দূর সিন্ধুপারে। কিন্তু তাঁর নৌকা তটের কিনারে বাঁধা পড়ে গেছে। কবি তা অগ্রাহ্য করে দাঁড় টেনে এগিয়ে চলেন। কিন্তু কবির জীবন-তরী আটকা পড়ে গেছে। প্রতিবার দাঁড় টানলে যে শব্দ ওঠে তা যেন স্রোতের ঠাট্টা-উপহাস। গতিশীল স্রোতের বিরুদ্ধে কবি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারেন না। তাই স্রোত কবির এই থমকে স্থবিরতাকে বিদ্রুপ করে।
৩. ‘সারারাত মিছে দাঁড় টানি’ – এমন বলার কারণ কী ?
উঃ কবি যে দূর সিন্ধুপারের কোনো রূপকথার দেশে যেতে প্রতি মুহূর্তে চঞ্চল হয়ে ওঠেন, বাস্তবে কবির পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবু কবির সুদূর পিয়াসী মন আশায় বুক বাঁধে। তিনি ক্রমাগত দাঁড় টেনে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ‘নােঙর গিয়েছে পড়ে তটের কিনারে’। আসলে তিনি বাঁধা পড়ে আছেন জাগতিক জীবনের কর্মমুখর সংসারে। তাই তাঁর দাঁড় টানা বৃথা।
৪. অজিত দত্তের নোঙর কবিতা ‘একটি রূপক কবিতা’ – আলোচনা কর।
উঃ কবি অজিত দত্তের ‘নােঙর’ একটি রূপকধর্মী কবিতা। নানা প্রতীকের ব্যবহারে এই কবিতায় কবি-হৃদয়ের অনুভূতি ব্যঞ্জিত হয়েছে। নােঙরকে কবি বন্ধনের প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন। আর নদীর তট হল পরিচিত বাস্তবজগৎ। এই বাস্তব জগতের বাইরের জগৎই কবিতায় বর্ণিত ‘দূর সিন্ধুপার’। সেই দূর কাল্পনিক জগতে পাড়ি দিতে চেয়েও কবির জীবন-তরী বাঁধা পড়ে গেছে।
জোয়ারের ঢেউ অর্থাৎ কবির জীবনের আশা, আকাঙ্খা নৌকায় অর্থাৎ কবির মনের দরজায় মাথা ঠুকে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় সমুদ্রের দিকে ছুটে যায়। সেই দূর সমুদ্রেই পাড়ি দিতে চান কবিও। কাছি বাস্তবজীবনের নানা সম্পর্কের প্রতীক। জোয়ার-ভাটা হল কবির জীবনের ওঠা পড়ার প্রতীক। নােঙর যেমন বন্ধনের প্রতীক, তেমনি স্রোত হল গতির। কবিতায় উল্লেখিত ‘বাণিজ্য’, ‘পণ্য’ এসব হল জীবিকা, সৃষ্টি ও সম্পদের প্রতীক। এভাবেই নানা প্রতীকের প্রয়োগে কবিতার ব্যঞ্জনা প্রকাশ পেয়েছে। অতএব ‘নােঙর’ একটি আদর্শ রূপক কবিতা হয়ে উঠেছে।
৫. নোঙর কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার কর।
উঃ ‘নোঙর’ হল একটি ভারী বস্তু যা নৌকাকে জলের মধ্যে আটকে রাখে। ফলে নৌকা জলের স্রোতে ভেসে যেতে পারে না। কবি অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতায় ‘নোঙর’ মানব জীবনের বন্ধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
মানব জীবনও নৌকা সদৃশ। যারা ভাবুক প্রকৃতির মানুষ, তাঁরা জীবনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে এই বাস্তব সাংসারিক জীবন থেকে দূরে চলে যেতে চান। কিন্তু সংসার জীবনের নানা সম্পর্ক, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ নামক নোঙরে তাঁরা বাঁধা পড়ে যান। তাঁরা সুদূরের আহ্বানে এগিয়ে যেতে চান কিন্তু পারেন না। দৈনন্দিন জীবনের সীমাবদ্ধতায় তাঁরা আটকা পড়ে থাকেন। তাঁর জীবন যেন নোঙরে বাঁধা পড়া এক নৌকা। কবিতায় নোঙর হল বন্ধনেরই আর এক নাম। ফলে রূপকধর্মী এই কবিতায় নোঙরের বন্ধনই ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। তাই কবিতাটির নামকরণ ‘নোঙর’ সার্থক হয়ে উঠেছে।
অন্যান্য আলোচনা
| কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টি |
| ধীবর বৃত্তান্ত |
| ইলিয়াস |
| নব নব সৃষ্টি |
| হিমালয় দর্শন |
| নোঙর |
| আকাশে সাতটি তারা |
| আবহমান |
| খেয়া |
| দাম |
| চিঠি |
| আমরা |
| ভাঙার গান |
| নিরুদ্দেশ |
| রাধারাণী |
| চন্দ্রনাথ |


