রাশিয়ান কথাসাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের লেখা ছোটোগল্প ইলিয়াস। গল্পটি নবম শ্রেণির বাংলা বই সাহিত্য সঞ্চয়নে পাঠ্য। মূল ভাষা থেকে এটি বাংলায় অনূদিত। আমরা এর আগে কলিঙ্গদেশে ঝড়-বৃষ্টি এবং ধীবর বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমরা এই পোস্টে উক্ত গল্পের মূল বিষয় সহ আনুষঙ্গিক তথ্য জেনে নেওয়ার চেষ্টা করব। আশা করি পোস্টটি ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।
ইলিয়াস – প্রাসঙ্গিক তথ্য
গল্পের উৎস – Twenty Three Tales গল্পগ্রন্থ।
চরিত্র – ইলিয়াস, শামশেমাগী, মহম্মদ শাহ
অনুবাদক – গল্পটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মণীন্দ্র দত্ত।
বিষয়বস্তু
ইলিয়াস নামে এক বাস্কির বাস করত রাশিয়ার উফাপ্রদেশে। তার বিবাহের এক বছর পর পিতা মারা যান। ইলিয়সের অবস্থা তখন না ধনী, না দরিদ্র। কিন্তু কর্মনিষ্ঠ ও নিরলস ইলিয়সের সুব্যবস্থায় তার সম্পত্তি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। তার অবস্থার উন্নতিতে প্রতিবেশীরা ঈর্ষা করে। তার খ্যাতি বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
তার সন্তান বলতে দুই ছেলে, এক মেয়ে। সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু ইলিয়স ধনী হয়ে ওঠার পর তার ছেলেরা ক্রমশ আয়েশি হয়ে উঠে। বড়ো ছেলেটি মারামারিতে মারা যায়। ছোটো ছেলেটি ঝগড়াটে বউ বিয়ে করে এবং বাবার অবাধ্য হয়ে ওঠে। তাকে কিছু সম্পত্তি দিয়ে ইলিয়স তাড়িয়ে দেয়। ফলে তার সম্পত্তিতে টান পড়ে। এরপরও ভেড়ার পালে মড়ক, খাদ্যাভাব, গরু-মোষের মড়ক এবং ঘোড়া চুরির ফলে ইলিয়সের আর্থিক অবস্থা আরো খারাপ হয়।
শেষাবধি ইলিয়সের অবস্থা এতই করুণ হয়ে ওঠে যে বৃদ্ধ বয়সে সে বাধ্য হয়ে সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। উভয়ে অসহায় অবস্থায় আশ্রয় পায় মহম্মদ শা নামে এক দয়ালু প্রতিবেশীর কাছে। তারা সেখানে মজুরের মত কাজ করতে লাগল। একদিন মহম্মদ শার বাড়িতে কিছু অতিথি এলে মহম্মদ শা অতিথিদের সঙ্গে ইলিয়াসের পরিচয় করিয়ে দেয়। তার কাহিনি শুনে অতিথিদের মধ্যে জাগে বিস্ময় ও সহানুভুতি। এখন কেমন কাটছে তাদের জীবন ? জীবন সম্পর্কে তাদের উপলব্ধি কী ? শামশেমাগী জানায় দীর্ঘ ৫০ বছরে তারা সুখ খুঁজে পায় নি। বরং সম্পত্তি হারিয়েই তারা সুখে বাস করছে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব – এককথায় উত্তর
১. ইলিয়াসের বিয়ের কত দিন পর তার বাবা মারা যান ?
উঃ এক বছর
২. বাবা মারা যাবার সময় তার কতগুলি ঘোড়া ও গরু ছিল ?
উঃ সাতটি ঘোড়া ও দুটি গরু
৩. বাবা মারা যাবার সময় সম্পত্তি হিসেবে ইলিয়াসের কতগুলি ভেড়া ছিল ?
উঃ কুড়িটি
৪. ইলিয়াসের স্ত্রীর নাম কী ?
উঃ শামশেমাগী
৫. ইলিয়াস ও তার স্ত্রী একটানা কতদিন পরিশ্রম করে অনেক সম্পত্তি করেছিল ?
উঃ পঁয়ত্রিশ বছর
৬. একটানা পরিশ্রম করার পর ইলিয়সের কতগুলি ঘোড়া হয়েছিল ?
উঃ দুশোটি
৭. একটানা পরিশ্রম করার পর তার কতগুলি ঘোড়া বেড়েছিল ?
উঃ একশো তিরানব্বইটি
৮. একটানা পরিশ্রম করার পর ইলিয়াসের কতগুলি গরু হয়েছিল ?
উঃ দেড়শোটি
৯. একটানা পরিশ্রম করার পর ইলিয়সের কতগুলি ভেড়া হয়েছিল ?
উঃ বারোশোটি
১০. ইলিয়াসের মোট সন্তান সংখ্যা কয়টি ছিল ?
উঃ তিনটি
১১. ইলিয়াসের দুর্দশা তার কত বছর বয়সে চরমে উঠেছিল ?
উঃ সত্তর বছর বয়সে
১২. মারামারিতে মারা গিয়েছিল কে ?
উঃ বড় ছেলে
১৩. সত্তর বছর বয়সে ইলিয়স তার কোন সম্পত্তিটি বিক্রি করেছিল ?
উঃ পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন
১৪. উভয়ের বৃদ্ধাবস্থায় কে আশ্রয় দিয়েছিল ?
উঃ মহম্মদ শা
১৫. ‘এ বিষয়ে তিনিই পুরো সত্য বলতে পারবেন’ – এখানে ‘তিনি’ কে ?
উঃ শামশেমাগী
১৬. ইলিয়াসের বাসস্থান কোথায় ?
উঃ রাশিয়ার উফা প্রদেশে
১৭. ‘বোলবোলাও’ শব্দের অর্থ কী ?
উঃ খ্যাতি
১৮. ইলিয়াসের পুত্র ও কন্যার সংখ্যা কয়টি ?
উঃ পুত্র সংখ্যা দুটি এবং কন্যা সংখ্যা একটি
১৯. ‘বুড়িকেও নিয়ে এসো’ – ‘বুড়ি’ কাকে বোঝানো হয়েছে ?
উঃ ইলিয়াসের স্ত্রী শামশেমাগীকে
২০. কুমিস কী ?
উঃ এক প্রকার পানীয়
২১. ‘এটা তামাশা নয়’ – বক্তা কে ?
উঃ ইলিয়াস
২২. ‘আমরা পেয়েছি সত্যিকারের সুখ’ – একথা কে বলেছেন ?
উঃ শামশেমাগী
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
১. ‘এ বিষয়ে তিনিই পুরো সত্য বলতে পারবেন।’ – বক্তা কে ? ‘তিনি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে ? তিনি কেন ‘পুরো সত্য’ বলতে পারবেন ?
উঃ উদ্ধৃতাংশের বক্তা ইলিয়াস।
এখানে ‘তিনি’ বলতে ইলিয়াসের স্ত্রী শামশেমাগিকে বোঝানো হয়েছে।
মহম্মদ শা-এর গৃহে আসা অতিথিরা ইলিয়াসের পূর্ব ও বর্তমান অবস্থার নিরিখে বর্তমান অনুভবের কথা জানতে চাইলে, ইলিয়াস তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে বলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী মেয়ে মানুষ, তাঁর মনেও যা মুখেও তাই। তাই তার স্ত্রী শামশেমাগি তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সত্য কথাই বলবেন।
২. ‘পঞ্চাশ বছর ধরে সুখ খুঁজে খুঁজে এতদিনে পেয়েছি।’ – বক্তব্যটির তাৎপর্য লেখ। অথবা বক্তার একথা বলার কারণ কী ?
উঃ লিও তলস্তয়ের লেখা ‘ইলিয়াস’ গল্পে এই উক্তিটি করেছেন ইলিয়াসের স্ত্রী শামশেমাগি। ইলিয়াসেরা এক সময় যথেষ্ট ধনী হয়ে উঠেছিলেন। নিজেদের এলাকায় তো বটেই, অনেক দূর পর্যন্ত তাদের খ্যাতি ছিল। কিন্তু সেই সময় তাদের ধন, সম্পদ বা অর্থসুখ থাকলেও মনে শান্তি ছিল না। বাড়িতে আসা অতিথিদের কীভাবে যত্ন নেওয়া যায় যাতে লোকনিন্দা না হয় সে বিষয়ে চিন্তা করতে হত, মজুরেরা যাতে কাজে ফাঁকি না দিতে পারে তার জন্য কড়া নজর রাখতে হত, গৃহপালিত পশুর ক্ষতি হবে এই ভেবে সর্বদা মনে দুশ্চিন্তা লেগেই থাকত। আর এইসব চিন্তার মাঝে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক কথা বলা বা ঈশ্বর চিন্তা করা – এজন্য কোনো রকম সময় ছিল না।
কিন্তু আজ যখন তারা দরিদ্র, তাদের সেই অর্থসুখ নেই তবু মনে শান্তি আছে। এখন তারা একসঙ্গে সকালে ওঠেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। মনিবের সেবা করেন এবং সেখান থেকে গ্রাসাচ্ছাদন করেন। তাদের এখন খাদ্যাভাব নেই, শীতের রাতে গরম কাপড়ের অভাব নেই। ঈশ্বর চিন্তার জন্য তাদের যথেষ্ট সময় আছে। ফলে তারা আগের থেকে সুখী। কারণ, তাদের মনে শান্তি আছে।
৩. ইলিয়াসের দুর্দশার কারণ কী ছিল তা আলোচনা কর।
উঃ ইলিয়াস উফা প্রদেশের একজন বাসকির ছিলেন। তিনি দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের কঠিন পরিশ্রমের কারণে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তার সেই সম্পত্তিতে টান পড়ে। তার দুর্দশা উপস্থিত হয়।
ইলিয়সের দুর্দশার কারণগুলি হল –
(১) ইলিয়াসদের অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তার ছেলেরা বিলাসী হয়ে ওঠে। তারা আগের মতো আর পরিশ্রম করে না।
(২) বড়ো ছেলেটি মারামারি করে মারা যায়। ছোটো ছেলে এক ঝগড়াটে বউ বিয়ে করে আনে। তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ছেলেকে একটি বাড়ি ও কিছু গরু ঘোড়াও দেওয়া হয়। এর ফলেও তার সম্পত্তিতে টান পড়েছিল।
(৩) ইলিয়সের ভেড়ার পালে মড়ক লেগে যাওয়ার কারণে অনেকগুলি ভেড়ার মৃত্যু ঘটে। আবার তারপরের বছরই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, ফলে বহু গরু মারা যায়।
(৪) ইলিয়াসের ভালো ভালো ঘোড়াগুলিকে কিরবিজরা চুরি করে নেয় ফলে ইলিয়াসের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে ওঠে।
(৫) সত্তর বছর বয়সে তাদের সংসারে অভাব দেখা দেয়। শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। এইভাবে ইলিয়সদের দুর্দশা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
৪. ‘এটা খুবই জ্ঞানের কথা’ – কার, কোন কথাকে ‘জ্ঞানের কথা’ বলা হয়েছে?’
উঃ ইলিয়াস এবং তাঁর স্ত্রী তাদের জীবনের বিশেষ অভিজ্ঞতা, মহম্মদ শাহর বাড়িতে আসা অতিথিদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। তারা বলেন, যখন তারা ধনী ছিলেন, সেই সময় তাদের জীবনে অর্থসুখ থাকলেও জীবনে কোনো প্রকার শান্তি ছিলনা – মন সর্বদাই দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকতো। কিন্তু তারা দরিদ্র হয়ে মনিবের বাড়ি কাজ করার সময় প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছেন, কারণ আজ তাদের কোনো রকম দুশ্চিন্তা নেই।
তাদের মতে, এটাই প্রকৃত জীবন। তারা প্রথমে সব ধন-সম্পত্তি হারিয়ে দুঃখ পেয়েছিলেন, কিন্তু ঈশ্বরের আশীর্বাদে জীবনের প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ইলিয়াসের এই কথাগুলিকেই মোল্লা সাহেব ‘জ্ঞানের কথা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
৫. ‘ইলিয়াস’ গল্প অবলম্বনে ইলিয়াস চরিত্রটি বিশ্লেষণ কর।
উঃ লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পের প্রধান চরিত্র ইলিয়াস। আলোচ্য গল্পে আমরা তার চরিত্রটিকে যেভাবে পাই তা নীচে বর্ণনা করা হল –
ইলিয়াস রাশিয়ার উফা প্রদেশের একজন বাসকির। তার স্ত্রীর নাম শাম-শেমাগি। তাদের দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল। জীবনের প্রথম দিকে তার আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। একটানা পঁয়ত্রিশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর ইলিয়াস ধনী হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে সে সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে ভাড়াটে মজুরের জীবন কাটাতে শুরু করে। ফলে জীবনের ওঠা-নামার সাক্ষী ইলিয়াস।
ইলিয়াস ছিল কঠোর পরিশ্রমী এবং কর্মনিষ্ঠ। তার পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই প্রতি বছর উন্নতি করে সে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়। শেষজীবনেও মহম্মদ শা-এর বাড়িতে মজুরের কাজ করার সময় সে কঠোর পরিশ্রম করে মনিবকে সন্তুষ্ট রাখতে পেরেছিল।
ইলিয়াসের বড় গুণ ছিল অতিথিপরায়ণতা। তার গৃহে আগত অতিথিদের সে কুমিস, চা, শরবত, মাংস দিয়ে যথাযথ আপ্যায়ন করত। এ বিষয়ে তার কোনো কার্পণ্য ছিল না। তার এই গুণের কথা দূর-দূরান্তেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
পিতা হিসেবে ইলিয়াস ছিল অত্যন্ত কঠোর কিন্তু কর্তব্যবোধে পরিপূর্ণ। তাই তার ছােটো ছেলে ও তার ঝগড়াটে স্ত্রী তার আদেশ অমান্য করায় তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি। কিন্তু সেই পুত্রের প্রতিও ইলিয়াস পালন করেছে যথাযথ কর্তব্য। তাদের একটি বাড়ি এবং কিছু গৃহপালিত পশু দিয়েছে।
সব থেকে বড় কথা, ইলিয়াসের ছিল সত্য জীবনদৃষ্টি। জীবনের শেষ পর্যায়ে সব সম্পত্তি হারিয়েও সে যেভাবে প্রকৃত সত্য ও সুখ উপলব্ধির কথা বলেছে, তাতে ইলিয়াস চরিত্রটিকে সার্থক করে তুলেছে।
অন্যান্য আলোচনা
| কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টি |
| ধীবর বৃত্তান্ত |
| ইলিয়াস |
| নব নব সৃষ্টি |
| হিমালয় দর্শন |
| নোঙর |
| আকাশে সাতটি তারা |
| খেয়া |
| চিঠি |
| আমরা |
| নিরুদ্দেশ |
| রাধারাণী |
| চন্দ্রনাথ |

