নবম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে একটি বিশেষ পাঠ্য আকাশে সাতটি তারা কবিতাটি। আমরা এই কবিতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর যেমন দেখে নেব, তেমনি কবিতার মূল বক্তব্যটিও জেনে নেব। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক তথ্যেও নজর দেব। আশা করি আলোচনাটি ছাত্রছাত্রীদের সহায়ক হবে। তোমাদের অন্যান্য আলোচনাগুলি পেতে একেবারে নীচে দেওয়া তালিকা দেখ।
আকাশে সাতটি তারা – মূল বক্তব্য
কবিতা হিসেবে আকাশে সাতটি তারা একটি সনেট। অতি সাধারণ বস্তু, ঘটনা ও প্রকৃতির মধ্যেই বাংলার প্রাণ লুকিয়ে আছে। আলোচ্য কবিতায় কবি বাংলার সন্ধ্যা প্রকৃতির অপরূপ চিত্র অঙ্কন করেছেন। আকাশে সাতটি তারা ফুটে উঠলে কবি নরম ঘাসে বসে তা প্রত্যক্ষ করেন। তিনি দেখেন বাংলার বুকে কেশবতী কন্যার রূপে যেন নেমে আসে শান্ত, স্নিগ্ধ নীল সন্ধ্যা। সন্ধ্যাকালীন রূপসী বাংলার এমন অপরূপ রূপ কবি আর কোথাও দেখেননি।
প্রাসঙ্গিক তথ্য
‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি নানা উপমা, বিশেষণ, গাছ, মাছের নাম ব্যবহার করেছেন। সেগুলি তালিকা আকারে নীচে দেওয়া হল।
উপমাঃ কামরাঙা (লাল মেঘের তুলনা), মৃত মনিয়া (মেঘের ডুব), কেশবতী কন্যা (মেঘ)
বিশেষণঃ শান্ত, নীল (বাংলার সন্ধ্যা)
গাছঃ হিজল, কাঁঠাল, জাম, কলমী, মুথাঘাস
মাছঃ চাঁদা, সরপুঁটি
সাতটি তারা অর্থেঃ সপ্তর্ষিমণ্ডল (মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ ও ক্রতু)
উৎস – ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ
এককথায় প্রশ্নোত্তর
১. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটির কবি কে ?
উঃ জীবনানন্দ দাশ
২. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত ?
উঃ রূপসী বাংলা
৩. কবি আকাশে সাতটি তারা বলতে কী বুঝিয়েছেন ?
উঃ সপ্তর্ষিমণ্ডলকে
৪. যখন আকাশে সাতটি তারা ফুটে ওঠে তখন কবি কী করেন ?
উঃ ঘাসে বসেন
৫. আলোচ্য কবিতায় কবি লাল মেঘকে কীরূপে বিশেষিত করেছেন ?
উঃ কামরাঙা
৬. ‘কামরাঙা-লাল মেঘ’ কোথায় ডুবে গেছে ?
উঃ গঙ্গাসাগরে
৭. গঙ্গাসাগরে ‘কামরাঙা-লাল মেঘে’র ডুবে যাওয়া প্রসঙ্গে কবি কোন চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন ?
উঃ মৃত মনিয়া
৮. বাংলার সন্ধ্যা প্রসঙ্গে কবি কোন রঙের প্রয়োগ করেছেন ?
উঃ নীল রঙ
৯. ‘——– কন্যা যেন এসেছে আকাশে’ – শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ কেশবতী
১০. কবির কোন অঙ্গের উপর কেশবতী কন্যার চুল ভাসে ?
উঃ চোখ ও মুখ
১১. অজস্র চুলের চুমা ঝরার প্রসঙ্গে কবি কোন গাছের উল্লেখ করেছেন ?
উঃ কাঁঠাল
১২. ‘কিশোরীর চালধোয়া ভিজে ——–‘ শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ হাত
১৩. আলোচ্য কবিতায় কবি কীসের ‘মৃদু ঘ্রাণে’র কথা বলেছেন ?
উঃ চাঁদা সরপুঁটি
১৪. ‘চালধোয়া ভিজে হাত’ কার ?
উঃ কিশোরীর
১৫. কবির ভাষায় কিশোরের পায়ে কী দলিত হয়েছে ?
উঃ মুথাঘাস
১৬. আলোচ্য কবিতায় কবি কোন গাছের লাল ফলের উল্লেখ করেছেন ?
উঃ বট
১৭. আলোচ্য কবিতার চরণ সংখ্যার বিভাজনটি কেমন ?
উঃ ৮ + ৬
১৮. আলোচ্য কবিতায় কবি কোন গাছের উল্লেখ করেছেন ?
উঃ হিজল, কাঁঠাল, জাম
১৯. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় উল্লেখিত একটি মাছ হল –
উঃ চাঁদা
২০. সপ্তর্ষিমণ্ডলের সাতটি তারা কী কী ?
উঃ মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ ও ক্রতু
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
১. ‘পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখে নি কো–’ বক্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
উঃ কবি জীবনানন্দ দাশ সর্বদা এই বঙ্গভুমিকে পৃথিবীর সর্বাধিক রূপসী নারী রূপে দেখেছেন। বাংলার মতো এত সৌন্দর্য্য, রূপ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। সূর্যাস্তের পর বাংলার মাটিতে যে সন্ধ্যা নামে তা যেন কোনো এক কেশবতী কন্যার উন্মুক্ত কেশরাশি। তার চুলের রাশি যেন আকাশে ছড়িয়ে ঘনিয়ে তোলে অন্ধকার। এমনটি পৃথিবীর অন্যত্র দেখা যায় না। কবি সন্ধ্যাকালীন বাংলার প্রকৃতিকে উদ্ধৃত চরণে প্রকাশ করেছেন।
২.’এরই মাঝে বাংলার প্রাণ; — তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
উঃ কবি জীবনানন্দের কাছে এই বাংলা কেবল এক ভূখণ্ড নয়, এক রূপসী মূর্তি। কবি তাকে অনুভব করেন গন্ধ- বর্ণ-স্পর্শ দিয়ে। কবি তাঁর ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় বাংলার সন্ধ্যার অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। হিজল, কাঁঠাল, বট, বটের লাল ফল, কলমি শাক, মুথা ঘাস, মাছ, কিশোর, কিশোরী —এই সব নিয়েই বাংলার প্রকৃতি রূপময়৷ এই প্রকৃতির মধ্যেই কবি বাংলার প্রাণকে অর্থাৎ সজীব সত্তাকে উপলব্ধি করেন।
৩. “বাংলার নীল সন্ধ্যা” – এরকম বলার কারণ কী ? অথবা, কবি ক্লেন বাংলার সন্ধ্যাকে ‘নীল’ বলেছেন ?
উঃ ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতায় কবি বাংলার সন্ধ্যাকে ‘নীল’ বলেছেন। আসলে দিনান্তের রক্তিম সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আকাশে এখন নীলের আবির্ভাব। সন্ধ্যা অর্থাৎ দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ। এই সময় সূর্যের রক্তিম বর্ণ যেমন নেই, তেমনি নেই রাত্রির কালো অন্ধকারও। মেঘমুক্ত নীল আকাশে এখন জ্বলজ্বল করছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। তাই কবি সন্ধ্যাকে নীল বলেছেন।
৪. কবিতায় ‘কামরাঙা লাল মেঘ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উঃ এই বাংলার একটি ফল কামরাঙা। কাঁচা অবস্থায় এই ফলের রং সবুজ। কিন্তু পাকা অবস্থায় ফলটির রঙ সিঁদুরে লাল। বাংলার আকাশ থেকে সূর্য যখন অস্তপ্রায়, তখন সূর্যের লাল রঙের আভায় আকাশে মেঘের কিনারে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। মেঘের এই রূপ কবিকে কামরাঙার লাল রঙের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই কবি ‘কামরাঙা লাল মেঘ’ উপমার ব্যবহার করেছেন।
৫. ‘আমার চোখের পরে, আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে’ – বক্তব্যটি ব্যাখ্যা কর।
উঃ বাংলার আকাশে যখন সূর্যাস্ত হয়ে সাতটি তারা ফুটে উঠেছে সেই সময় কবি ঘাসের উপর বসেন। বঙ্গপ্রকৃতির বুকে নেমে আসা সন্ধ্যাকে তিনি রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ দিয়ে অনুভব করেন। তাঁর মনে হয়, যেন এক এলোকেশী কন্যার আবির্ভাব হয়েছে সন্ধ্যার আকাশে। সেই কন্যার ছড়িয়ে পরা কালো চুলের মতো ধীরে ধীরে অন্ধকার নামে। কবি তাঁর চোখে মুখে সেই অন্ধকারের স্পর্শ অনুভব করেন।
৬. ‘আকাশে সাতটি তারা’ কবিতা অনুসারে কবির প্রকৃতিপ্রীতির পরিচয় দাও।
উঃ প্রকৃতিপ্রেমিক কবি জীবনানন্দ দাশ এই বাংলাকে রূপসী হিসেবেই দেখেছেন। তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের প্রতিটি কবিতায় বঙ্গপ্রকৃতির নানা রূপ, নানা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন। আমাদের পাঠ্য ‘আকাশে সাতটি তারা’ সেরকমই এক কবিতা। বাংলার বুকে নেমে আসা সন্ধ্যার অপরূপ দৃশ্য কবি তাঁর সমস্ত সত্তা দিয়ে যেন অনুভব করেন। বাংলার সেই রূপ তিনি কেবল দু-চোখ ভরে দেখেছেন তাই নয়, তাঁর দৃষ্টিতে ঘনায়মান সন্ধ্যা যেন কেশবতী কন্যা। সেই রূপসীর এলোচুল কেবল কবির চোখ ও মুখের ওপর ভাসে তা-ই নয়, হিজলে, কাঁঠালে, জামেও অবিরত ঝরে।
কবি মনে করেন, সন্ধ্যার এই দৃশ্য বাংলা ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। হিজল, কাঁঠাল, জাম, বট, কলমি, মুথাঘাস, নরম ধান, হাঁস, শর, পুকুরের জল, চাঁদা-সরপুঁটি এসব নিয়ে বাংলার প্রকৃতি জগৎ। এসবের নিজস্ব ঘ্রাণ যেন রূপসী বাংলার ‘কেশবতী কন্যা’র চুলের বিন্যাস থেকে ঝরে পড়া স্নিগ্ধ গন্ধ। কবি তাঁর গভীর ভালবাসা ও মমত্ব দিয়ে বাংলার সন্ধ্যার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। আর সেই বর্ণনার সূত্রে কবির প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যান্য আলোচনা
| কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টি |
| ধীবর বৃত্তান্ত |
| ইলিয়াস |
| নব নব সৃষ্টি |
| হিমালয় দর্শন |
| নোঙর |
| খেয়া |
| চিঠি |
| আমরা |
| নিরুদ্দেশ |
| রাধারাণী |
| চন্দ্রনাথ |

