আমরা এর আগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবসম্প্রসারণ উপস্থাপন করেছি। আজ আরও কয়েকটি ভাব সম্প্রসারণের উদাহরণ দেওয়া হল। আমাদের এই ওয়েবসাইটের নির্মিতি বিভাগে প্রবন্ধ রচনা, প্রতিবেদন রচনা, ভাবার্থ সহ নানা বিষয় পাবে। এই পেজের একেবারে শেষে দেওয়া লিঙ্ক থেকে তোমরা সেগুলি দেখে নিতে পারো।
ভাব সম্প্রসারণের উদাহরণ
আজকের গুরুত্বপূর্ণ ভাব সম্প্রসারণের উদাহরণ দেখো –
প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম গোত্র হীন..
প্রাচীরের ছিদ্রে এক নাম গোত্র হীন
ফুটিয়াছে ফুল এক অতিশয় দীন।
ধিক্ ধিক্ বলে তারে কাননে সবাই
সূর্য উঠি বলে তারে ভালো আছো ভাই?
প্রাচীরের ছিদ্রে প্রস্ফূটিত নাম গোত্রহীন কিংবা শোভাহীন ক্ষুদ্র ফুলকে বাগানের ফুলেরা স্বীকৃতি না জানিয়ে ধিক্কার জানায়। কিন্তু অবহেলিত সেই ছোটো ফুলকেই স্বয়ং সূর্য স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত মহত্ব।
ক্ষুদ্রের মহিমা ক্ষুদ্র মানুষে স্বীকার করে না। তা কেবল মহৎ ব্যক্তিই করতে পারেন। কোনো মানুষ সমাজের নিম্ন স্তরে জন্মগ্রহণ করতে পারে আবার কেউ উঁচু স্তরে। সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাদের ধন সম্পদের প্রাচুর্য আছে, সমাজের উচ্চ স্তরের বাসিন্দা তারা। সাধারণত তারা শ্রদ্ধা পায়, সম্মান লাভ করে। অথচ সেই মানুষগুলিই সমাজের অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্গের মানুষদের সমান চোখে দেখে না। তাদের কাছে যেন সমাজের সব মানুষ সমান নয়।
কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে মানুষ, যারা নিজেদের চেতনায় মহৎ তারা সর্বদা সুন্দরের আলোয় আলোকিত। তাদের কাছে মানুষ হিসেবে কেউ ছোটো বা বড় নয়। সকলকেই তারা সমান চোখে দেখেন। তারা সূর্যের মতোই মহৎ এবং উদার। সূর্য যেমন বাগানের ফুলকেও আলো দেয় তেমনি প্রাচীরের গায়ে ফোটা অখ্যাত ফুলকেও কুশল জানায়, তেমনি সমাজের মহৎ ব্যক্তিরাও সকলকেই সম্মান করে। যখন নিম্ন স্তরের মানুষদের অন্যে অবহেলা দেখায় তখন এই উদার মানুষেরা তাদের যেকোনো প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন। এই উদারতার আলোকেই তারা সমাজের সকলকে সমানভাবে মর্যাদা দেন। তারা ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ভেদে কোনো বৈষম্য করেন না।
শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির..
শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির।
শৈবালের জন্ম দীঘির জলে। পরম মমতায় দীঘি তাকে তার বিরাট বক্ষে স্থান দেয়। দীঘির জলেই শৈবালের বেড়ে ওঠা। তার গাত্রে জমা শিশির বিন্দু যখন দীঘির জলে পড়ে তখন শৈবাল অহংকার করে বলে, সে দীঘিকে এক ফোঁটা জল দিয়েছে। দীঘির বিরাট জলাভূমিতে ঐ একফোঁটা জল নগণ্য। যেখানে শৈবালের উচিত দীঘির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সেখানে সে নিজের অহংকারই প্রকাশ করে।
প্রকৃত পরোপকারী মানুষ নিজের অহং থেকে দূরে থাকেন। তারা উদারচিত্তে মানবপ্রেমে নিজেদের নিয়োজিত করেন। এরা সর্বদা সকল মানুষের হিত চিন্তা করেন। তারা নিজেদের জ্ঞান ও কর্ম দিয়ে দেশ, সমাজ ও জাতির কল্যাণ করে চলেন। তারা কখনোই আপন গৌরবের কথা অন্যের কাছে তুলে ধরেন না। তারা বটবৃক্ষ-সম অন্যকে আগলে রাখেন, স্নেহ-শীতল করেন। তারা কেবলই নিঃস্বার্থভাবে পরহিতব্রতে কাজ করে যান। তারা মিথ্যে প্রশংসার লোভ করেন না। পরের কল্যাণ সাধনেই তাদের আসল সুখ, প্রকৃত গৌরব।
অন্যদিকে সমাজে কিছু স্বার্থপর মানুষ আছে যারা অন্যের উপকারের কথা স্বীকার করেই না, বরং কখনো যদি উপকারীর সামান্যতম উপকার করে, তবে তা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে। তারা বোঝেও না যে তারা কতটা ক্ষুদ্রমনা। এই প্রকার ব্যক্তি সমাজের কাছে সর্বদাই মূল্যহীন।
অন্যায় যে করে..
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।
সুস্থ সমাজ গড়তে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মানুষ গড়ে তুলেছে শাসন ব্যবস্থা এবং ন্যায়-নীতির মানদণ্ড। কিন্তু সেই সমাজে কিছু মানুষ থাকে যারা ন্যায়-নীতি অমান্য করে অন্যায় ও অবৈধ কর্মে নিজেদের নিযুক্ত করে। এরা আইনের চোখে অপরাধী হিসাবে বিবেচ্য। সেই সঙ্গে যারা অন্যায়ের বিরোধিতা না করে চুপ থাকে, সূক্ষ্ম বিচারে তারাও অপরাধী। কারণ, তাতে অন্যায়কারী প্রশ্রয় পায় ও অন্যায় বাড়তে থাকে।
ক্ষমা সর্বদা একটি মহৎ গুণ। কোনো অপরাধীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। কিন্তু একথাও মনে রাখা দরকার যে, ক্ষমারও একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। নতুবা অন্যায় প্রতিনিয়ত বেড়ে যাবে আর সমাজকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। তাই অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু কিছু মানুষ নানা কারণে তার প্রতিবাদ না করে দিনের পর দিন অন্যায়কে সহ্য করে। একদিক থেকে তা অন্যায়কে সহযোগিতা করার নামান্তর। এর ফলে সমাজে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। তাই অন্যায়কারী এবং অন্যায় সহ্যকারী উভয়ই সমান অপরাধী।
সকলের তরে সকলে আমরা..
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে
মানব জীবন কেবল আপন স্বার্থ চরিতার্থেই সার্থক নয়। একে অপরে কল্যাণের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতা। পারস্পরিক সহযোগিতার বোধেই মানব জাতির প্রকৃত বন্ধন গড়ে তোলে। তাতেই আছে মানুষের বাঁচার আনন্দ, জীবনের সার্থকতা।
মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। কারণ, মানুষ কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাকে ভূমিকা রাখতে হয়। সমাজের সঙ্গে তার বন্ধন দৃঢ়। মানুষ যদি সমাজের কল্যাণের জন্য নিজ নিজ সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুসারে ভূমিকা না নেয় তবে সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। শুধু তাই নয়, শেষ পর্যন্ত তা ব্যক্তি-জীবনেও সংকট নিয়ে আসে।
আমাদের সমাজে এমন কিছু আত্মকেন্দ্রিক মানুষ আছে যারা বৃহৎ সমাজের জন্য নয়, নিজের স্বার্থ পূরণে মগ্ন থাকে। যে সমাজ মানুষকে নিরাপত্তা দেয়, তাকে শান্তি-শৃঙ্খলা, সুখ-সমৃদ্ধি দেয়, বিপদে সাহায্য করে এ সত্য ঐসব স্বার্থাণ্বেষী মানুষ মনে রাখে না। তাদের এই প্রকার মনোবৃত্তি সমাজ স্বার্থ বিরোধী। তারা কেবল সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্বের কথা ভুলে যায় তাই নয়, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়ে। এইসব মানুষের জীবন যেন রেশম পোকার জীবনের মতোই খোলসাবৃত। তাদের জীবন শুধু টিকে থাকে, বেঁচে থাকে না।
বস্তুত মানুষকে বাঁচতে হয় সবার সঙ্গে, সবার মধ্যে, সবার জন্য। সে বাঁচাই যথার্থ বাঁচা। পরস্পরের মঙ্গলের মধ্য দিয়েই সমাজের কল্যাণ হয়। মানুষের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে।
যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না..
যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে
সহস্ৰ শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে ;
যে জাতি জীবনহারা অচল অসাড়
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।
চির চলিষ্ণু স্রোতস্বিনী নদী দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে সম্মুখের দিকে। লক্ষ্য তার বৃহৎ সমুদ্র। কিন্তু সেই নদী যদি তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে ফেলে তবে শত সহস্র শৈবাল তাকে ঘিরে ধরে। জীবনের সঙ্গে নদীর রয়েছে গভীর মিল। নদীর মতোই জীবনও চির চলমান। জীবন নানা রূপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে তার পূর্ণতার লক্ষ্যে। কিন্তু জীবনের গতি যখনই স্তব্ধ হয়ে যায়, তখনই ঘনিয়ে আসে তার অন্তিম পর্ব। মৃত্যু গ্রাস করে জীবনকে।
শুধু ব্যক্তি সম্পর্কেই এ কথা প্রযোজ্য তা নয়, প্রযোজ্য সমষ্টি জীবনের ক্ষেত্রেও। সমাজের উন্নতি তার গতিশীলতায়। কিন্তু সেই গতি স্তব্ধ হয়ে গেলে সমাজ জীবন হারায় তার স্বাভাবিক ছন্দ। নদী যেমন তার স্রোত হারালে শৈবাল আচ্ছন্ন হয়ে স্তব্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়, তেমনই জাতির জীবনে নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা হারিয়ে গেলে সেই জীবন পঙ্গু হয়ে যায়। রক্ষণশীলতার পিঞ্জরে আবদ্ধ হলে কিংবা কুসংস্কার দ্বারা আচ্ছন্ন হলে, সমাজ ও জাতি স্থবির হয়ে পড়ে। আর তখন ধ্বংসের সংকেত ঘনিয়ে আসে।

