কারকের সম্পূর্ণ আলোচনায় কর্তৃকারক ও কর্মকারক সহ অন্যান্য কারকের বিস্তৃত পরিচয় ও নানা উদাহরণ পাবে। এগুলি অভ্যাস করলে তোমাদের পরীক্ষার ফল অনেক বেশি ভালো হতে বাধ্য। আমরা প্রথম পর্যায়ে উক্ত দুটি কারকের সবিস্তার পরিচয় জেনে নেব।
কারক – সাধারণ পরিচয়
কারক সম্পর্কে সংস্কৃত ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ক্রিয়াণ্বয়ি কারকম্। এ সম্পর্কে প্রথম প্রবক্তা হলেন বিশিষ্ট বৈয়াকরণ পাণিনি। পাণিনি তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থে কারকের সূত্র হিসেবে লিখেছেন – কৃ + ণ্বুল। ‘কারক’ শব্দের ব্যুৎপত্তি কৃ + অক। সামগ্রিকভাবে ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যস্থ নামপদের যে অণ্বয় বা সম্পর্ক তাই-ই কারক সম্পর্ক। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যাক –
উদাহরণঃ বিদ্যাসাগর তাঁর বাড়িতে দুঃস্থদের জন্য নিজ উপার্জন থেকে ছাত্রদের দিয়ে পোশাক দিচ্ছেন।
এই বাক্যে ‘দিচ্ছেন’ ক্রিয়া। এই ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যস্থ অন্যান্য পদের সম্পর্ক আছে। সম্পর্ক অনুসারে এক একটি কারক হয়। ক্রিয়ার সঙ্গে বাক্যের কর্তার যে সম্বন্ধ তা কর্তৃকারক, কর্মের যে সম্বন্ধ তা কর্মকারক ইত্যাদি। এখন বাক্যের ‘দিচ্ছেন’ ক্রিয়াকে কে, কী, কোথায়, কোথা থেকে, কাদের নিমিত্তে, কার দ্বারা দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর আসে তা এক একটি কারক সম্বন্ধ যুক্ত।
কারকের শ্রেণি ছয়টি। শ্রেণিগুলি হল – কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণ কারক, নিমিত্ত কারক, অপাদান কারক এবং অধিকরণ কারক। এছাড়া আমরা দুটি অকারক পদ পাই – (১) সম্বন্ধ পদ (২) সম্বোধন পদ।
কর্তৃকারক ও তার শ্রেণি
বাক্যের যে পদটি কোনো ক্রিয়া সম্পাদন করে তা কর্তা। এই কর্তার সঙ্গে ক্রিয়ার সম্বন্ধটি কর্তৃকারক হিসেবে পরিচিত। যেমন – ‘আকাশে পাখি ওড়ে।’, ‘মা গান করেন।’, ‘রবীন্দ্রনাথ ‘বলাকা’ লিখেছেন।’ এই তিনটি বাক্যের ক্রিয়াকে ‘কে ?’ দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তরটি আসে তা সংশ্লিষ্ট বাক্যের কর্তা। বাক্য তিনটিতে কর্তা হল যথাক্রমে ‘পাখি’, ‘মা’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ’।
প্রযোজক কর্তা
বাক্যের যে কর্তা নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়। ‘দিদি ভাইকে ছবি দেখায়।’ ছবি দেখছে ভাই কিন্তু সেই দেখার কাজটি করিয়ে নিচ্ছে দিদি। তাই দিদি এই বাক্যের প্রযোজক কর্তা।
প্রযোজ্য কর্তা
বাক্যের যে কর্তা প্রযোজক কর্তার প্রেরণায় ক্রিয়া সম্পাদন করে। নেয়। ‘দিদি ভাইকে ছবি দেখায়।’ দিদির প্রেরণায় ভাই ছবি দেখার ক্রিয়াটি সম্পাদন করছে। ভাই এই বাক্যের প্রযোজ্য কর্তা।
নিরপেক্ষ কর্তা
কোনো বাক্যে যদি সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পৃথক কর্তা থাকে তাহলে অসমাপিকা ক্রিয়ার কর্তাটি নিরপেক্ষ কর্তা হবে। ‘সূর্য অস্ত গেলে সন্ধ্যা নামে।’ বাক্যটিতে ‘গেলে’ অসমাপিকা ক্রিয়ার কর্তা ‘সূর্য’ নিরপেক্ষ কর্তা।
অনুক্ত কর্তা
কর্মবাচ্য ও ভাববাচ্যে ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তার সরাসরি সম্পর্ক না থাকলে সেই কর্তাটি অনুক্ত কর্তা বা উহ্য কর্তা হয়। ‘বঙ্কিমচন্দ্র কর্তৃক বন্দেমাতরম্ লিখিত হইয়াছে।’ বাক্যটিতে ‘হইয়াছে’ ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তা ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ -এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। এই কর্তাটি অনুক্ত কর্তা।
ব্যতিহার কর্তা
কেবল একটি ক্রিয়ার দুটি কর্তার পারস্পরিক ক্রিয়া সম্পাদনের ভাব প্রকাশ পেলে সেই দুই কর্তা ব্যতিহার কর্তা হয়। ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে।’ এই বাক্যে ‘করে’ ক্রিয়ার দুটি কর্তা ‘রাজায়’, ‘রাজায়’। এই দুই কর্তা পারস্পরিক ক্রিয়া সম্পাদন করছে। সেজন্য ‘রাজায় রাজায়’ ব্যতিহার কর্তা।
সহযোগী কর্তা
বাক্যস্থ দুটি কর্তার মধ্যে সহযোগিতার ভাব ফুটে উঠলে তা সহযোগী কর্তা হয়। ‘জমিদারবাবুর এমনই দাপট যে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়।’ এই বাক্যের দুটি কর্তা বাঘ ও গরুর মধ্যে সহযোগিতার ভাব পরিস্ফূট।
সমধাতুজ কর্তা
বাক্যের ক্রিয়াপদটি যে ধাতু জাত সেই একই ধাতু থেকে যদি বাক্যের কর্তাটি নিস্পন্ন হয় তবে সেই কর্তাটি হবে সমধাতুজ কর্তা। ‘পুজোর বাজনা বাজছে।’ এই বাক্যে ‘বাজছে’ ক্রিয়া এবং ‘বাজনা’ কর্তা একই ধাতু ‘বাজ্’ থেকে নিস্পন্ন।
বাক্যাংশ কর্তা
কোনো বাক্যের সমাপিকা ক্রিয়াহীন পদগুচ্ছ কর্তা স্বরূপ একটি অখণ্ড ভাবের প্রকাশ করলে তা বাক্যাংশ কর্তা হয়। এই ধরনের কর্তা উপবাক্যীয় কর্তা বলেও পরিচিত। ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া মানুষের বিশেষ স্বভাব।’ এই বাক্যের ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’ পদসমষ্টি বাক্যাংশ কর্তা হিসেবে প্রযোজ্য।
কর্মকারক ও তার শ্রেণি
বাক্যের কর্তা যা করছেন তাই কর্ম। ক্রিয়ার সঙ্গে কর্মের সম্বন্ধটি কর্মকারক। বাক্যের কর্ম পদটি সহজে বোঝার জন্য ক্রিয়াকে ‘কী’ অথবা ‘কাকে’ দিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। যেমন – মা রামায়ণ পড়েন, শ্যামল ভাইকে মারে। এই দুটি বাক্যের প্রথমটিতে ক্রিয়া ‘পড়েন’কে ‘কী’ দিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর আসে ‘রামায়ণ’। এই পদটি কর্ম সম্বন্ধযুক্ত। দ্বিতীয় বাক্যে ক্রিয়া ‘মারে’কে ‘কাকে’ দিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর আসে ‘ভাইকে’। এই পদটিও কর্ম সম্বন্ধযুক্ত।
মুখ্য কর্ম ও গৌণ কর্ম
কোনো কোনো বাক্যে দুটি কর্ম থাকতে পারে। ঐ দুটি কর্মের মধ্যে বস্তুবাচক কর্মটি হয় মুখ্য কর্ম আর প্রাণিবাচক কর্মটি হয় গৌণ কর্ম। যেমন – অনিতা দীপিকাকে চিঠি লিখছে। এই বাক্যে দুটি কর্ম যথাক্রমে ‘দীপিকাকে’ এবং ‘চিঠি’। এই দুটি কর্মের প্রথমটি প্রাণিবাচক, তাই এটি গৌণ কর্ম। অন্য কর্ম ‘চিঠি’ বস্তবাচক, তাই এটি মুখ্য কর্ম।
উদ্দেশ্য কর্ম ও বিধেয় কর্ম
বাক্যে কোনো কোনো কর্মের পরিপূরক হিসেবে অন্য আরো কিছু পদ ব্যবহৃত হয়। এই পরিপূরক পদকে বিধেয় কর্ম বলা হয়। প্রকৃত কর্মটি উদ্দেশ্য কর্ম। উদ্দেশ্য কর্ম বিভক্তি যুক্ত হয়, আর বিধেয় কর্মটি শূন্যবিভক্তি যুক্ত হয়। ‘অর্থকে পরমার্থ ভাবা ভুল।’ এই বাক্যে মুখ্য কর্ম ‘অর্থকে’ যা ‘কে’ বিভক্তিযুক্ত। এই কর্মের পরিপূরক ‘পরমার্থ’ শূন্য বিভক্তি যুক্ত হয়ে বাক্যে বসেছে।
সমধাতুজ কর্ম
‘সমধাতুজ’ শব্দটির অর্থ একই ধাতু থেকে। বাক্যের ক্রিয়াটি যে ধাতু-জাত সেই ধাতু থেকেই নিস্পন্ন কোনো বিশেষ্য যদি বাক্যের কর্ম হয় তবে তাকে সমধাতুজ কর্ম বলা হয়। ‘সুনীতা কী নাচই না নাচল’ – এই বাক্যের ক্রিয়াটি ‘নাচ্’ ধাতু-জাত। এই একই ধাতু থেকে বাক্যের কর্ম ‘নাচই’ নিস্পন্ন হয়েছে। সেজন্য বাক্যের এই কর্মটিকে সমধাতুজ কর্ম বলা হবে।
অনুক্ত কর্ম
কোনো বাক্যে সকর্মক ক্রিয়ার কর্মটি উহ্য থাকলে তা অনুক্ত কর্ম। এই কর্মের অপর নাম উহ্য কর্ম। ‘ছেলেটি বিছানায় পড়ছে’ – বাক্যের কর্ম ‘বই’ উহ্য রয়েছে।
অক্ষুণ্ণ কর্ম
কর্তৃবাচ্যের কর্ম কর্মবাচ্যেও অপরিবর্তিত থাকলে তা অক্ষুণ্ণ কর্ম নামে পরিচিত। যেমন – ‘সভাপতিকে মানপত্র দিলাম’। (কর্তৃবাচ্য) > ‘সভাপতিকে মানপত্র দেওয়া হল।’ (কর্মবাচ্য)
বাক্যাংশ কর্ম
সমাপিকা ক্রিয়াবিহীন কোনো বাক্যাংশ বা খণ্ডবাক্য কর্মরূপে ব্যবহৃত হলে তা বাক্যাংশ কর্ম হয়। এই কর্মের অপর নাম উপবাক্যীয় কর্ম। যেমন – ‘তার মা বলে – ঘুঁটে কুড়োনোর কোন্ গল্প বল তো ?’ এই বাক্যে ‘ঘুঁটে কুড়োনোর কোন্ গল্প বল তো ?’ অংশটি কর্মরূপে ব্যবহৃত।
কর্মের বীপ্সা
‘বীপ্সা’ শব্দের অর্থ পুনরাবৃত্তি। বাক্যে একই কর্মের বারবার ব্যবহার বা পুনরাবৃত্তি হলে কর্মের বীপ্সা হয়। যেমন – ‘জমিদার জনে জনে কাপড় বিতরন করলেন।’ এই বাক্যে কর্ম ‘জনে’র পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
আমরা এর পরবর্তী আলোচনায় বাকি কারকের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করব। সেইসঙ্গে তোমাদের অভ্যাসের জন্য কারকের নানা প্রশ্ন ও উদাহরণ তুলে ধরব। তোমরা ওয়েবসাইটটি নিয়মিত ফলো কর।
অন্যান্য আলোচনা
ব্যাকরণের সামগ্রিক সহায়তা পেতে গুগল প্লে স্টোর থেকে ইনস্টল করে নাও আমাদের ব্যাকরণ অ্যাপ – বাংলা ব্যাকরণ সমগ্র।


