কারকের সম্পূর্ণ আলোচনায় আমরা এর আগে কর্তৃকারক ও কর্মকারকের বিস্তৃত পরিচয় ও নানা উদাহরণ দেখিয়েছি। আজ কারক চেনার সহজ উপায় আলোচনায় বাকি কারক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলি অভ্যাস করলে তোমাদের পরীক্ষার ফল অনেক বেশি ভালো হতে বাধ্য।
কারক চেনার সহজ উপায়
কীভাবে সহজে কারক নির্ণয় করা যায় ? এই প্রশ্নের উত্তরে আসার আগে জেনে নাও বাকি চারটি কারক সম্পর্কে। কোনো বিষয়ে তোমাদের প্রশ্ন থাকলে তা কমেন্ট বক্সে লিখতে পারো। পাশাপাশি আমাদের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব আলোচনা দেখে নিতে পারো।
করণ কারক
বাক্যের কর্তা যার সাহায্যে কর্মটি সম্পাদন করে তাই হল করণ। করণের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্কটি করণ কারক। করণ কারক নির্ণয়ে বাক্যের ক্রিয়াকে ‘কী দ্বারা ?’ ‘কী দিয়ে ?’ ‘কীসের দ্বারা ?’ ইত্যাদি দিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। ‘এ কলমে কত লিখেছি।’ বাক্যের ক্রিয়া ‘লিখেছি’ কে ‘কী দ্বারা ?’ প্রশ্ন করলে উত্তর আসে ‘কলম’। বাক্যের কর্তা এই পদটি দিয়েই তার কর্ম সম্পাদন করছে। তাই এটি করণ। এই কারকের শ্রেণিগুলি হল –
যন্ত্রাত্মক করণ – এই প্রকার করণে পার্থিব বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু কর্তার কার্য সম্পাদনের উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুলি দিয়ে ছবি আঁকা যায়। ছুরি দিয়ে ফল কাটলাম। দুটি উদাহরণে চিহ্নিত পদ দুটি পার্থিব বস্তু। তাই এগুলি যন্ত্রাত্মক করণের উদাহরণ।
হেতুময় করণ – কার্যের হেতু বা কারণ বোঝাতে এই প্রকার করণ হয়। যেমন – তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে, ভয়ে গা শিউড়ে উঠল। চিহ্নিত পদ দুটি কার্যের হেতু বা কারণ নির্দেশ করে।
উপায়াত্মক করণ – কোনো পার্থিব বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু যদি কার্যসাধনের উপায় না হয় তবে তাকে উপায়াত্মক করণ বলে। যেমন – শরীরচর্চায় দেহমন ভালো হয়। কাজটি কৌশলে করলাম।
কালাত্মক করণ – কাল বা সময়জ্ঞাপক করণ হল কালাত্মক করণ। যেমন – বারো মাসে এক বছর হয়, সবকিছু ভেঙে গেল দু দণ্ডেই।
সমধাতুজ করণ – ক্রিয়াপদটি যে ধাতু থেকে নিস্পন্ন সেই একই ধাতু থেকে করণ কারকটি নিস্পন্ন হলে তাকে সমধাতুজ করণ বলা হয়। যেমন – সে মায়ার বাঁধনে বেঁধেছে আমায়। এই উদাহরণে চিহ্নিত পদটি ও ক্রিয়া একই ধাতু ‘বাঁধ্’ থেকে নিস্পন্ন হয়েছে।
লক্ষণাত্মক করণ – এই প্রকার করণটি হল লক্ষণ সূচক। যেমন – রাজপুত গোঁফে চেনা যায়। এই উদাহরণে চিহ্নিত পদটি পরিচয় বা লক্ষণ সূচক।
করণের বীপ্সা – ‘বীপ্সা’ শব্দের অর্থ আগেই বলা হয়েছে। যখন একই করণের পুনরাবৃত্তি করা হয় তখন তা করণের বীপ্সা হয়। যেমন – ফুলে ফুলে গাছ ভরেছে, পোস্টারে পোস্টারে দেওয়াল ছেয়ে গেছে।
নিমিত্ত কারক
নিঃস্বার্থভাবে দান করা হলে সম্প্রদান হয়। সংস্কৃত ব্যাকরণে সম্প্রদান কারক আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বাংলায় এই সম্প্রদানের অস্তিত্ব নিয়ে আছে নানা সংশয়। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্প্রদান কারককে কর্মকারকের অন্তর্ভূক্ত করতে চেয়েছেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বিশিষ্টগণ তাঁকেই সমর্থন করেছেন। আধুনিক বৈয়াকরণেরা সম্প্রদান কারককে বাংলা ব্যাকরণের আলোচনায় দেখাতে চান না, পরিবর্তে তাঁরা নিমিত্ত কারক নিয়েই আলোচনা করেছেন।
ক্রিয়ার সঙ্গে নিমিত্ত সম্বন্ধ বোঝাতে এই কারক হয়। বাক্যের ক্রিয়াকে ‘কার জন্য ?’ ‘কীসের নিমিত্তে ?’, ‘কার উদ্দেশ্যে ?’ ইত্যাদি দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তরটি আসে তা নিমিত্ত কারক হয়। যেমন – দেবতার জন্য ভোগ রান্না হচ্ছে। গরীবে সেবা কর।
অপাদান কারক
যা থেকে কোনো কিছু গৃহীত, রক্ষিত, পতিত, উৎপন্ন, চলিত, ভীত, বিরত, বঞ্চিত হয় তা অপাদান। ক্রিয়ার সঙ্গে যে পদের এই অপাদান সম্পর্ক তাকেই অপাদান কারক বলে। অপাদান কারক নির্ণয়ে বাক্যের ক্রিয়াকে ‘কোথা থেকে ?’, ‘কী হইতে ?’ ইত্যাদি দিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। যেমন – কালো মেঘে বৃষ্টি হয়, তিল থেকে তেল হয়। অপাদানের শ্রেণিগুলি হল –
স্থানবাচক অপাদান – এই প্রকার অপাদানে কোনো আধার বা স্থানকে নির্দেশ করা হয়। যেমন – ব্যাগ থেকে টাকাটা পড়ে গেছে, রাজা রথ থেকে লাফিয়ে নামলেন।
কালবাচক অপাদান – এই প্রকার অপাদানে সময় বা কালকে নির্দেশ করা হয়। যেমন – সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে, ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে।
দূরত্ববাচক অপাদান – এই প্রকার অপাদানে দুটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব বোঝায়। যেমন – জঙ্গল হতে গ্রাম মাইল খানেক দূর। কলকাতা থেকে হাওড়া বেশি রাস্তা নয়। কোনো কোনো বৈয়াকরণ দূরত্ববাচক অপাদানকে স্থানবাচক অপাদানের গোত্রভূক্ত করেছেন।
তারতম্যবাচক অপাদান – এই প্রকার অপাদানে দুটি বস্তু বা ব্যক্তির মধ্যে তারতম্য নির্দেশ করে। যেমন – নিবেদিতার চেয়ে বসন্ত বয়সে বড়ো। চিত্রণের থেকে তূর্ণি অধিক অলস।
অধিকরণ কারক
‘অধিকরণ’ বলতে বোঝায় ক্রিয়ার আধারকে। বাক্যের যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদটি বাক্যস্থ ক্রিয়ার আধার, স্থান বা কালকে বোঝায় তাকে অধিকরণ কারক বলে। অধিকরণ কারক নির্ণয়ে বাক্যের ক্রিয়াকে ‘কোথায় ?’, ‘কখন ?’ ও ‘কীসে ?’ দিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। যেমন – আলিপুরে চিড়িয়াখানা আছে, শীতকালে অনেক সবজি মেলে, ছেলেটি গণিতে পারদর্শী। অধিকরণের বিভিন্ন শ্রেণি। যেমন –
স্থানাধিকরণ – এই প্রকার অধিকরণে কোনো স্থানে ক্রিয়াটি নিস্পন্ন হয়। যেমন – বিপুল দিল্লিতে পড়ে, কালো আকাশে তারার মেলা বসেছে।
কালাধিকরণ – এই প্রকার অধিকরণে কাল বা সময় ক্রিয়ার আধার হয়। যেমন – আজ সকালে কুয়াশা হয়েছে, বর্ষায় অধিক বৃষ্টি হয়।
বিষয়াধিকরণ – এই প্রকার অধিকরণে কোনো বিষয় ক্রিয়ার আধার হয়। যেমন – শর্মা বাবু সংস্কৃতে পণ্ডিত মানুষ, মেয়েটি তার রূপে লক্ষ্মী।
অধিকরণে বীপ্সা – একই অধিকরণের পুনরাবৃত্তি ঘটলে তখন অধিকরণের বীপ্সা হয়। যেমন – বনে বনে ফুল ফুটেছে, গ্রামে গ্রামে খবরটি ছড়িয়ে গেল।
ব্যাকরণের অন্যান্য আলোচনা
ব্যাকরণের সামগ্রিক সহায়তা পেতে গুগল প্লে স্টোর থেকে ইনস্টল করে নাও আমাদের ব্যাকরণ অ্যাপ – বাংলা ব্যাকরণ সমগ্র।


