নবম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে একটি বিশেষ পাঠ্য কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা আবহমান কবিতাটি। আমরা আজ কবিতাটির বিষয়বস্তু ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর জেনে নেব। তার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক তথ্যেও নজর দেব। আশা করি আলোচনাটি তোমাদের সহায়ক হবে। তোমাদের অন্যান্য আলোচনাগুলি পেতে একেবারে নীচে দেওয়া তালিকা দেখ।
আবহমান কবিতা – প্রাসঙ্গিক তথ্য
উৎসঃ অন্ধকার বারান্দা
কবিতার রচনাকালঃ ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ।
মোট স্তবক / চরণ সংখ্যাঃ ৭টি / ৩৪টি
উল্লেখ আছে – লাউমাচা, নটেগাছ, কুন্দ ফুল
মূলকথাঃ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতোই আবহমানকাল ধরেই রয়েছে পল্লিপ্রকৃতির কোলে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা, যা কখনোই ফুরোয় না। বহমান জীবন সত্যের কথাই আবহমান কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে।
এককথায় প্রশ্নোত্তর
১. ‘আবহমান’ কবিতাটি কার লেখা ?
উঃ কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর
২. কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ?
উঃ অন্ধকার বারান্দা
৩. ‘আবহমান’ কবিতায় স্তবক সংখ্যা কয়টি ?
উঃ সাতটি
৪. ‘আবহমান’ কবিতার মোট চরণ সংখ্যা কতগুলি ?
উঃ ৩৪টি
৫. ‘আবহমান’ শব্দটির সাধারণ অর্থ কী ?
উঃ ক্রমাগত / যা অনন্ত কাল ধরে বহমান
৬. কবি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবার কথা বলেছেন ?
উঃ লাউমাচার পাশে
৭. ‘ছোট্ট একটা ফুল দুলছে’ – ফুল দোলার কারণ কী ?
উঃ কারণ সন্ধ্যার বাতাস বইছে
৮. আবহমান কবিতা অনুসারে লাউমাচাটির অবস্থান কোথায় ?
উঃ উঠোনে
৯. ‘কে এইখানে এসেছিল —— বছর আগে’ – শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ অনেক
১০. আবহমান কবিতায় কোন গাছ বুড়িয়ে ওঠার কথা বলেছেন কবি ?
উঃ নটেগাছ
১১. কবির ভাষায় কী ‘ফুরয় না’ ?
উঃ যাওয়া, আসা, পিপাসা
১২. ‘সারাটা —— আপন মনে ঘাসের গন্ধ মাখে’ – শূন্যস্থান পূরণ কর।
উঃ দিন
১৩. কবিতায় স্বপ্ন আঁকার প্রসঙ্গে কীসের কথা বলা হয়েছে ?
উঃ তারায় তারায়
১৪. ‘নেভে না তার’ – কী না নেভার কথা বলেছেন কবি ?
উঃ যন্ত্রণা
১৫. আলোচ্য কবিতায় কবি কোন ফুলের উল্লেখ করেছেন ?
উঃ কুন্দ
১৬. আবহমান কবিতার কোন স্তবকে কবি কুন্দফুলের কথা বলেছেন ?
উঃ ষষ্ঠ স্তবকে
১৭. ছায়া নামলে কী ছুটে আসার কথা বলেছেন কবি ?
উঃ নদীর হাওয়া
১৮. কবি লাউমাচার পাশে দাঁড়াতে বলেছেন কেন ?
উঃ কারণ পল্লিবাংলার সহজ জীবনকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়।
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
১. ‘যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া’ – কবি কেন উঠানে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন ?
উঃ ‘আবহমান’ কবিতার এই অংশে কবি বাংলার প্রকৃতিজাত সহজ জীবনের কথা বলেছেন। পল্লিবাংলায় যে ঘর তৈরি করা হয়, সেখানে ঘরের সামনে থাকে উঠোন। উঠোনের খোলা স্থানে ছোটো ছোটো কিছু গাছ লাগানো হয়। কেউ কেউ মাচা করেও সেখানে পুঁই, লাউ জাতীয় নানা রকম গাছ লাগায়।
কবির কথায়, ঘর থেকে বেরিয়ে এলে লাউমাচা দেখতে পাওয়া যাবে। সেই লাউ মাচায় ফুল ধরেছে। সন্ধ্যার সময় নদীর শীতল হাওয়া ভেসে আসে। সেই হাওয়া ফুলগুলিকে নাড়া দিয়ে যায়। ফুলগুলি দুলতে থাকে। উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে লাউমাচা আর সন্ধ্যার হাওয়াতে দোদুল্যমান ফুলগুলিকে দেখতে পাওয়া যায়।
২. ‘এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে।’ – কবির এমন কথা বলার কারণ কী ?
উঃ পৃথিবীতে জীবনের অন্যতম উপাদান মাটি ও হাওয়া। এই দুয়ের উপরেই নির্ভর করে জীবন গড়ে উঠেছে। মাটি বসবাসের স্থান আর বাতাস দেয় অক্সিজেন। প্রথম যুগে মানুষ কোনো এক ভূখণ্ডে অর্থাৎ মাটির উপরেই তৈরি করেছিল তার থাকার আশ্রয়। মাটিতেই সে খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থাও করেছিল। তারপর কত যুগ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষের ঘর বাঁধার আকাঙ্খা আজও বর্তমান। যে মাটিতে সে জন্মেছে, বড় হয়েছে, সেই মাটিকেই আঁকড়ে থাকার ইচ্ছা তার চিরন্তন।
কোনো কারণে ফেলে আসা ঘরের প্রতি মানুষের মমতা ও আকর্ষণ তার জন্মগত, চিরকালীন। মানুষ এই মাটির টানে মানুষ ফিরে আসে – ভালোবেসে ঘর বাঁধে। মানুষের ঘর বাঁধার এই তাগিদ, ভিটের প্রতি টানকে বোঝাতেই কবি উক্ত কথাগুলি বলেছেন।
৩. ‘সারাটা দিন আপন মনে ঘাসের গন্ধ মাখে’ – তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
উঃ আপন জন্মভিটের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। যদি কেউ কখনও তার আপন ভিটে ছেড়ে দূর দেশে চলে যায় তবু সে বারবার নিজের ভিটেতেই ফিরে আসতে চায়। কারণ, সেই ভিটে কেবল মাটি নয়, তা আত্মার যোগে সমৃদ্ধ। সেই ভিটের প্রতিটি ধুলিকণা, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঘাস তার সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে। সব কিছুর মধ্যেই আছে তার ভালবাসা, তার সুখ-দুঃখের স্মৃতি। এই স্মৃতি কোনোদিন ভোলার নয়। তাই কখনও দূর দেশে চলে গেলেও তার মনে সর্বদা মাতৃভূমির বুকে ফিরে আসার বাসনা থাকে।
যখন সেই মানুষ তার মাতৃভূমির কাছে আসে তখন সে তার পুরনো চেনা প্রকৃতিকে খুঁজে নিতে চায়। আপন মনে স্মৃতিচারণায় সে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। আসলে ঐ মাটির সঙ্গে তার নিবিড় সংযোগ। ঐ মাটির মধ্যে সে নিজেকে যেন খুঁজে পায়।
৪. ‘নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না।’ – নটেগাছের প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ কী বিশ্লেষণ কর।
উঃ নটেগাছের প্রসঙ্গ আমরা পাই রূপকথার গল্পে। সেই গল্পে দুষ্টু রানির কথা, তার সৎ মেয়েকে কষ্ট দেওয়া, রাজ্যের প্রজাদের উপর দৈত্যদের অত্যাচারের কথা থাকে। গল্পের সমাপ্তি হয় দুষ্টু বুদ্ধির পরাজয়ে আর শুভ বুদ্ধির জয়লাভে। গল্পের শেষে উল্লেখ করা হত – ‘নটে গাছটি মুড়ালো আমার কথাটি ফুড়ালো’। এর মাধ্যমে একটা সুখদায়ক পরিসমাপ্তি বোঝানো হত।
নটে আসলে একটি একবর্ষজীবি গাছ। এক বছর পরে গাছটি শুকিয়ে যায়। কিন্তু আলোচ্য কবিতায় কবি নটে গাছকে সময়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মানুষের ঘর গড়ার ইচ্ছা, ভিটেমাটির প্রতি তীব্র আকর্ষণের কোনো বদল হয় না। সময় নিজের নিয়মে অতিবাহিত হয়। কিন্তু মানুষ কোনো কারণে নিজের ভিটে থেকে দূর দেশে চলে গেলেও চেষ্টা করে তার ভিটেতে পুনরায় ফিরে আসতে। নিজের জন্মভূমির প্রতি এই প্রবল আকর্ষণ যেন চিরন্তন।
আবার অন্যদিকে, যুগের পর যুগ অতিক্রান্ত হলেও প্রকৃতির রূপ থাকে অমলিন। পূর্ব দিগন্তে সূর্যোদয়, পশ্চিমে সূর্যাস্ত, তার সোনালি রূপ, নদীর উপর থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস, পল্লিবাংলার কুটিরের মাচায় লাউগাছ – সবই যেন অপরিবর্তনীয়। গ্রাম বাংলার এই চিত্র বহু বছর পরেও একই থেকে যায়। তাই কবির ভাষায়, নটে গাছটি বুড়িয়ে উঠলেও কখনো মুড়িয়ে যায় না।
৫. ‘আবহমান’ শব্দের অর্থ কী? কবিতাটির নামকরণ কতখানি সার্থক বলে তুমি মনে কর ?
উঃ ‘আবহমান’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল ‘যা অনন্ত কাল ধরে বহমান’। চিরকালীন বা শাশ্বত অর্থ বোঝাতে ‘আবহমান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
নিজের আশ্রয়ের জন্য বহু বছর আগে থেকেই মানুষ ঘর বাঁধতে শুরু করেছে। নিজের খাদ্য সংস্থানের জন্য চাষ করেছে, ফসল ফলিয়েছে। তারপর প্রবহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু তার ঘর বাঁধার তাগিদ, জন্মভূমির প্রতি টান, হাওয়াকে ভালবাসার অদম্য ইচ্ছার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার প্রিয় ভিটে, উঠোনের ছোটো লাউমাচার প্রতি আকর্ষণ প্রবল।
যদি কেউ কখনো কোনো কারণে নিজের ভিটে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়, তবুও তার চির চেনা ভিটের জন্য মন সর্বদা অস্থির হয়ে থাকে। চির পরিচিত ‘ঘাসের গন্ধ’ মাখতে তার মন উন্মুখ হয়ে থাকে। এদিকে নিয়মমাফিক সময় এগিয়ে চলে। প্রতিদিন সূর্য উঠে, অস্ত যায়, সন্ধ্যা নামে, সন্ধ্যার বাতাস নদীর উপর থেকে গ্রামের বুকে ছুটে আসে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য চিরকালীন। এর কোনো শেষ নেই। ঠিক এরকমই মানুষের মনে ঘর বাঁধার আকাঙ্খাও চিরকালীন। এই সকল ঘটনা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। আলোচ্য কবিতায় ব্যক্ত ভাবটি কবিতার নামকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই কবিতার নামকরণ যথার্থ হয়েছে।
অন্যান্য আলোচনা
| কলিঙ্গ দেশে ঝড়-বৃষ্টি |
| ধীবর বৃত্তান্ত |
| ইলিয়াস |
| নব নব সৃষ্টি |
| হিমালয় দর্শন |
| নোঙর |
| আকাশে সাতটি তারা |
| খেয়া |
| দাম |
| চিঠি |
| আমরা |
| নিরুদ্দেশ |
| রাধারাণী |
| চন্দ্রনাথ |

