সাহিত্য সঞ্চয়ন (X)

হারিয়ে যাওয়া কালি কলম – শ্রীপান্থ

শ্রীপান্থের লেখা হারিয়ে যাওয়া কালি কলম প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক কলম ও কালির বিবর্তন কথা শুনিয়েছেন। আমরা প্রবন্ধের মূলকথাটি জানার পাশাপাশি দেখে নেব প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তরগুলি। আমাদের দেওয়া তথ্যগুলি তোমাদের কেমন লাগছে তা কমেন্টে জানিও। আমরা এর আগে আফ্রিকা কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের এই আলোচনায় উক্ত প্রবন্ধ থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেব।

হারিয়ে যাওয়া কালি কলম – মূলকথা

পরিবর্তন ও বিবর্তনের ধারায় সবকিছুই কোনো না কোনোদিন কালের গর্ভে বিলীন হয়। পুরাতন চলে যায়। তার স্থানাধিকার করে নতুন। কালি কলমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই। একসময়ের খাগের বা পালকের কলম কিংবা বাড়িতে তৈরি কালি আজ বিবর্তিত হয়েছে অনেক। এমনকি তাদের ব্যবহারও নগণ্য। পরিবর্তে এসেছে টাইপরাইটার, কম্পিউটার। এই গবেষণামূলক রচনাটিতে লেখক যেমন ফিরে গেছেন অতীতের নস্ট্যালজিয়ায় তেমনি বর্তমানেও বিচরণ করেছেন সমানভাবে। শুনিয়েছেন ফাউন্টেন পেনের জন্মকথা। তার সংগ্রহের কথা। এমনকী কলমের খুনি ভূমিকার কথাও।

প্রশ্নোত্তর পর্ব – এককথায় উত্তর

১. ‘কথায় বলে’ – প্রসঙ্গত লেখক কোন প্রচলিত ছড়াটির উল্লেখ করেছেন ?
উঃ কালি কলম মন, লেখে তিন জন      

২. ‘বাংলায় একটা কথা চালু ছিল’ – চালু থাকা কথাটি কী ?
উঃ কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি

৩. ছোটোবেলায় লেখকেরা কী দিয়ে কলম তৈরি করতেন ?
উঃ রোগা বাঁশের কঞ্চি

৪. ছোটোবেলায় লেখকরা বড়োদের কাছে কী শিখেছিলেন ?
উঃ কলমের মুখ চেরা

৫. লেখকরা ছোটোবেলায় কোনটিকে ‘লেখার পাত’ হিসেবে ব্যবহার করতেন ?
উঃ কলাপাতা

৬. ক-অক্ষর গোমাংস -এর অর্থ কী ?
উঃ অক্ষরজ্ঞানহীন

৭. কালি তৈরির বিষয়ে লেখকদের কারা সাহায্য করতেন ?
উঃ মা, পিসি, দিদিরা

৮. কালি তৈরির জন্য লেখকেরা কড়াইয়ের তলায় পড়া কালি কী দিয়ে ঘসে তুলতেন ?
উঃ লাউপাতা

৯. ওস্তাদেরা কালি তৈরিতে কী ব্যবহার করত ?
উঃ হরিতকী

১০. কোন জাতি বনপ্রান্ত থেকে হাড় কুড়াত ?
উঃ ফিনিসিয়ান

১১. ব্রোঞ্জের শলাকাটির পোশাকি নাম কী ?
উঃ স্টাইলাস

১২. জুলিয়াস সিজার কাকে আঘাত করেছিলেন ?
উঃ কাসকাকে

১৩. চিনারা চিরকাল কীসে লিখে আসছে ?
উঃ তুলিতে

১৪. পালকের কলমের ইংরেজি নাম কী ?
উঃ কুইল

১৫. ‘এক সময় বলা হতো’ – এক সময় কী বলা হতো ?
উঃ কলমে কায়স্থ চিনি, গোঁফেতে রাজপুত

১৬. ফাউন্টেন পেনের নাম ‘ঝরনা কলম’ কার দেওয়া হতে পারে ?
উঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের

১৭. ফাউন্টেন পেনের আবিষ্কর্তা কে ?
উঃ ওয়াটারম্যান

১৮. কোন কলমকে লেখক ‘জাদু-পাইলট’ বলেছেন ?
উঃ জাপানি পাইলট

১৯. লেখক শৈলজানন্দের সংগ্রহে কতগুলি ফাউন্টেন পেন ছিল ?
উঃ ডজন দুয়েক

২০. ফাউন্টেন পেন সংগ্রহের নেশা শৈলজানন্দ কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন ?
উঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

২১. আদিতে ফাউন্টেন পেনের কী নাম ছিল ?
উঃ রিজার্ভার পেন

২২. আগে কালি শুকোনোর জন্য কী ব্যবহার করা হত ?
উঃ বালি

২৩. কার সোনার দোয়াত-কলম ছিল ?
উঃ সুভো ঠাকুরের

২৪. সর্বাপেক্ষা দামী কলমটির মূল্য কত ?
উঃ আড়াই হাজার পাউন্ড

২৫. ‘লাঠি তোমার দিন ফুরাইয়াছে’ – কথাটি কার ?
উঃ বঙ্কিমচন্দ্রের

২৬. ‘ক্যালিওগ্রাফিষ্ট’ কথাটির অর্থ কী ?
উঃ লিপি-কুশলী

২৭. অষ্টাদশ শতকে চারখণ্ড রামায়ণ অনুবাদের নগদ মূল্য কত ছিল ?
উঃ সাত টাকা

২৮. উনিশ শতকে বত্রিশ হাজার অক্ষর লেখার মূল্য কত ছিল ?
উঃ বারো আনা

২৯. ‘টাইপ-রাইটারে লিখে গেছেন মাত্র একজন’ – তিনি কে ?
উঃ অন্নদাশঙ্কর রায়

৩০. শেষ পর্যন্ত নিবের কলমের মান কে বজায় রেখেছেন ?
উঃ সত্যজিৎ রায়

ব্যাখ্যাধর্মী প্রশ্নোত্তর

১. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে প্রাচীনকালে বহির্বিশ্বে কলমের রূপ ও ব্যবহার সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় তা নিজের ভাষায় লেখ।

উত্তরঃ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ কলমের প্রাচীন ইতিহাসের উল্লেখ করেছেন। কেবল বাংলা তথা ভারতের কলমের প্রাচীনত্বের উল্লেখ নয়, আছে বহির্বিশ্বে প্রাচীন কলমের রূপ ও ব্যবহারের কথাও।

নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতায় যে কলম ব্যবহার করা হত তা ভোঁতা তুলির মতো। ফিনিসীয় সভ্যতায় কলম তৈরি হত জীবজন্তুর সূচালো হাড় দিয়ে। ব্রোঞ্জের শলাকা দিয়ে কলম তৈরি করা হত প্রাচীন রোমে যার পোশাকি নাম ‘স্টাইলাস’। আর চিনারা তুলি দিয়েই কলমের কাজ করত। এক কথায় সারা বিশ্বেই কলম হিসেবে ব্যবহৃত হত সূচালো কোনো শলাকা।

২. পালকের কলম ও দোয়াত কলম সম্পর্কে লেখক কী বলেছেন প্রবন্ধ অনুসারে লেখ।

উত্তরঃ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে লেখক কলমের ক্রমবিবর্তনের নানা পর্যায় আলোচনা করতে গিয়ে পালকের কলমের কথা বলেছেন। পালকের কলম তৈরি হত পাখির পালক সূচালো করে কেটে। তারপর তা কালিতে ডুবিয়ে লেখা হত। পালকের কলমের প্রচলন ছিল উনিশ শতকের প্রথম দিকে। ইংরেজিতে এই কলমকে ‘ক্যুইল’ বলা হয়। এখন আর পালকের কলমের ব্যবহার নেই। এর নিদর্শন দেখতে হলে পুরনো দিনের তৈলচিত্র বা ফটোগ্রাফির সাহায্য নিতে হবে।

দোয়াত কলম হল কালির দোয়াতে নিব ডুবিয়ে লেখার কলম। পালকের কলমের মুখ সহজেই ভোঁতা হয়ে যেত বলে কাঠের বা ধাতুর দণ্ডের ডগায় শিং কিংবা ধাতুর নিব বসানো হল। এই ধরনের কলমের জন্য বড়ি গুলে কালি তৈরি হত। আবার বোতলে বা দোয়াতেও কালি পাওয়া যেত। এই কলমের জন্য দোয়াত তৈরি হত নানা আকৃতির ও নানা উপাদান দিয়ে; যেমন কাচের, পোর্সেলিনের, পিতলের, শ্বেতপাথরের। বর্তমানে এই কলমেরও ব্যবহার বন্ধ হয়েছে।

৩. কলম এখন সর্বজনীন –মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।

উত্তরঃ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে লেখক শ্রীপান্থ কলমের বিবর্তনের একটা চিত্র তুলে ধরেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কঞ্চির কলম, পালকের কলম, নিবের কলম, ঝরনা কলম থেকে আধুনিককালের ডট পেনের কথা বলা হয়েছে। এতে লেখালেখির ক্ষেত্রে যেমন অনেক সুবিধা হয়েছে তেমনি সহজলভ্য হয়েছে নানা ধরনের কলম। শিক্ষার প্রসার ও বিভিন্ন পেশার তাগিদে কলমের ব্যবহারও বেড়েছে অনেকখানি।

একটা সময় পণ্ডিত বা দার্শনিকের খ্যাতি ছিল কলম কানে গুঁজে রাখার জন্য। কিন্তু বর্তমানে কলম কারো একার কুক্ষীগত নয়। তা অল্প শিক্ষিত ও শিক্ষিত সকলেরই প্রয়োজনের বস্তু। ফলে কলমের চাহিদা যেমন আছে তেমনি তা পাওয়াও যায় অতি সহজে। ট্রামে বাসে কলম বিক্রেতার অভাব নেই। লেখক জানিয়েছেন, সস্তা হওয়ার জন্য পকেটমারও এখন কলম নিয়ে হাতসাফাই করে না। অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায় কলমের স্থান এখন শুধু বুক পকেটে নয়, পায়ের মোজায় কিংবা চুলের খোপাতেও কলম বিরাজমান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৌলতে কলমের আধুনিক রূপ আর তার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘটেছে কলম বিপ্লব। ফলে কলম এখন সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

আরও পড়ো

৪. ক্যালিওগ্রাফিস্ট কাদের বলা হয় ? আলোচ্য প্রবন্ধ থেকে এদের সম্পর্কে কী জানা যায় ?

উত্তরঃ যারা হস্তলিখনে দক্ষ অর্থাৎ যারা কলম দিয়ে হস্তাক্ষরে কোনো বিষয় রচনা করেন কিংবা অন্য কোনো লেখার নকল করেন তাঁদের ক্যালিওগ্রাফিস্ট বা লিপি কুশলী বলা হয়।

যখন ছাপাখানার প্রচলন হয়নি তখন প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করতে ক্যালিওগ্রাফিস্টদের দরকার হতো। প্রাচীনকালে রাজদরবারে কিংবা প্রশাসনিক কার্যালয়ে এদের কদর ছিল। লিপি কুশলীরা রাজা জমিদারের কাছে ছিলেন সম্মানীয় ব্যক্তি। এরা হস্তাক্ষরে সুনিপুণ ছিলেন। এদের হাতের লেখা সুশৃঙ্খল ও প্রতিটি অক্ষর সমান হতো। অনেক সময় সাধারণ গৃহস্থেরাও এদের দিয়ে পুথি নকল করাতেন। লিপি কুশলীরা কাজ অনুসারে পারিশ্রমিক পেতেন। উনিশ শতকে বারো আনায় বত্রিশ হাজার অক্ষর লেখানো যেত। বর্তমানে টাইপরাইটার বা কম্পুটারের দৌলতে লিপি কুশলীদের প্রয়োজন নেই বললেই চলে।

৫. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে কোন কোন প্রবাদের ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার প্রাসঙ্গিকতা কোথায় ?

উত্তরঃ প্রবাদে দীর্ঘদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতা ধরা থাকে। সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবাদের ব্যবহার প্রায়শই দেখা যায়। শ্রীপান্থের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধেও আছে রকমারি প্রবাদের ব্যবহার যার মধ্য দিয়ে নানা প্রসঙ্গের উত্থাপন করেছেন লেখক।

প্রবন্ধের শুরুতেই ‘কালি কলম মন / লেখে তিন জন’ প্রবাদের উল্লেখে কালি ও কলমের বিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন লেখক। কোনো লেখা তখনই সম্পন্ন হয় যখন কালি, কলম আর মনের একত্র সংযোগ ঘটে। আবার বর্তমান আধুনিকতায় কম্পুটার ব্যবহারকারী লেখক যার কাছে কলম নেই তার অবস্থা বোঝাতে লেখক ব্যবহার করেছেন এই প্রবাদের – ‘কালি নেই, কলম নেই, বলে আমি মুনশি।‘

কালি তৈরির প্রাচীন পদ্ধতির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে – ‘তিল ত্রিফলা সিমুল ছালা / ছাগ দুগ্ধে করি মেলা / লৌহপাত্রে লোহায় ঘষি / ছিঁড়ে পত্র না ছাড়ে মসি।‘ এখানে রয়েছে কালি তৈরির প্রাচীন অভিজ্ঞতা ও লোকশিক্ষার কথা। একটা সময় কলম যে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা বোঝাতে লেখকের ব্যবহৃত প্রবাদটি হল – ‘কলমে কায়স্থ চিনি, গোঁফেতে রাজপুত।‘

পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝাতে অক্ষর-জ্ঞানহীনকে ‘ক-অক্ষর গোমাংস’ বলা হয়ে থাকে। আবার অল্প শিক্ষিত অহঙ্কারী মানুষকে ব্যঙ্গ করে লেখক বলেছেন – ‘কালির অক্ষর নাইকো পেটে চণ্ডী পড়েন কালীঘাটে।‘ এভাবে নানা প্রবাদের উল্লেখ করে লেখক সমসাময়িক ও তার পূর্বকালীন সমাজ ইতিহাসকে ছুঁয়ে গেছেন এবং প্রতিটি প্রবাদ যথাযথ প্রসঙ্গে প্রযুক্ত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!