সাহিত্য সঞ্চয়ন (X)

আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি

দশম শ্রেণির জন্য পাঠ্য কবি শঙ্খ ঘোষের আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি কবিতাটি নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা। আমরা এর আগে অসুখী একজন কবিতাটি নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের আলোচ্য কবিতা থেকে আমরা কবিতার মুখ্য বিষয় ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর দেখে নেব। আগ্রহীরা এই কবিতার মক টেস্ট দিতে চাইলে এখানে ক্লিক কর।

বিষয়বস্তু

কবিতার শুরু জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতার পরিচয় দিয়ে। আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে অশুভ শক্তি। ডান পাশে ধস, বামে গিরিখাদ, মাথায় বোমারু পায়ে হিমানীর বাঁধ। ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে শিশুদের শব। কবির মনে প্রশ্ন জাগে তাহলে কী আমাদের এইভাবেই মরে যেতে হবে ? এর থেকে উত্তরণের উপায় কী ? কবির আহ্বান – ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ – আমরা দল বেঁধে থাকি।

সমাজের অবক্ষয়ে বিপন্ন আমরা। ‘আমরা ভিখারি বারোমাস’। শোষণ, বঞ্চনা আর অত্যাচারের শিকার হয়ে আমরা এমন অবস্থায় আছি যে পৃথিবী আদৌ বেঁচে আছে কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ জাগে মনে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন ? তাই কবির আহ্বান বেঁচে থাকা ক’জনের উদ্দেশ্যে, জোটবদ্ধ হয়ে হাতে হাত রেখে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে লড়াই চালানোর। একমাত্র সঙ্ঘবদ্ধ গণ আন্দোলনই পারে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করতে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব

১. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় সমাজের সাধারণ মানুষের কোন বিপন্নতার ছবি ফুটে উঠেছে তা লেখ।

উত্তরঃ ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় কবি বিপন্ন মানুষের ছবি এঁকেছেন। কবিতায় দেখা যায়, সাধারণ মানুষের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ –তাদের কোনোদিকেই এগিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মাথার উপর নেই কোনো আচ্ছাদন, পায়ের তলায় নেই মাটি। চারদিকে ছড়ানো শিশুদের শব। বিপন্ন এই মানুষেরা সাহায্যের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। তারা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার বিষয়ে সন্দিহান।

২. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ –কবির এমন আহ্বানের তাৎপর্য লেখ।

উত্তরঃ ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় কবি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের কথা বলেছেন। চারদিক থেকেই তাদের চলার পথ রুদ্ধ। যে শিশুদের নিয়ে তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে তাদের লাশ এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের মনে সন্দেহ জাগে এভাবেই তারা মরে যাবে নাকি ? উপায়হীন এই মানুষদের সঙ্কটের মোকাবিলা করতে কবি আরো বেঁধে বেঁধে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

কবিতায় আরও স্পষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষের ইতিহাসহীনতার কথা। কিংবা তাদের যে ইতিহাস তা সত্যকে আড়াল করে। তাদের অন্যের দ্বারে ভিখারির মতো ঘুরতে হয়। নানাভাবে বিপন্ন এই মানুষগুলির মধ্যে যে কয়জন রয়ে গেছে তাদের নিয়েই কবি প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন। ফলে কবির আহ্বান ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

৩. পৃথিবী হয়তো গেছে মরে –এমন কথা বলার কারণ কী ?

উত্তরঃ ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় বিপন্ন ও সর্বস্বান্ত মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের কোনো দিকেই এগোনোর উপায় নেই। বিপদ তাদের জন্য ডানে-বামে এবং উপর-নীচে ওঁৎ পেতে আছে। শুধু তাই নয়, তাদের শিশুরাও আজ মৃত্যুমুখে পতিত। তাদের এমন অবস্থা দেখেও বাকিরা নিশ্চুপ। ঐ সব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাদের মনে কোনো প্রভাব ফেলে না। বিপর্যস্ত মানুষগুলির প্রতি সমাজের বাকিদের এই উদাসীনতা দেখেই কবি উক্ত কথাগুলি বলেছেন।

আরও পড়ো

৪. ‘আমাদের কথা কে বা জানে’ – ‘আমরা’ কারা ? তাদের কথা কেউ জানে না কেন ?

উত্তরঃ ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতার উদ্ধৃত চরণে ‘আমরা’ বলতে অবক্ষয়িত সমাজের নিপীড়িত, বিপন্ন মানুষদের বোঝানো হয়েছে।

সাধারণ মানুষ স্পষ্টতই বিপন্ন, ঘরছাড়া। তাদের এগোনোর সব রকম পথ আজ রুদ্ধ। তারা অন্যের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করে। এইসব সর্বহারা মানুষের কথা ইতিহাসে স্থান পায়না কিংবা তাদের যে ইতিহাস লেখা হয় তা বিকৃত। পৃথিবীর বাকি মানুষের কোনো আগ্রহ নেই এইসব মানুষদের নিয়ে। তারা এদের কথা জানতেও চায় না।

৫. ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতায় কবি কীভাবে সর্বহারাদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছেন তা বিশ্লেষণ কর।

উত্তরঃ কবি শঙ্খ ঘোষ একজন সমাজ-সচেতন ও সংবেদনশীল কবি। সামাজিক বা রাষ্ট্রিক কোনো অন্যায় তিনি মেনে নিতে পারেননি। আলোচ্য কবিতায় কবি তাঁর বক্তব্য বিষয় উত্তম পুরুষে বর্ণণা করেছেন। আসলে তিনি সর্বহারা বিপন্ন মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন এই কবিতায়।

কবিতায় কবি ‘আমরা’, ‘আমাদের’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন সচেতনভাবেই। কবি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের কথা বলেছেন। চারদিক থেকেই তাদের চলার পথ রুদ্ধ। যে শিশুদের নিয়ে তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে তাদের লাশ এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে। কবি নিজেও যেন রয়েছেন এই ভুক্তভোগীদের দলে। তাই কবি লেখেন –

‘আমরাও তবে এইভাবে/এ-মুহূর্তে মরে যাব নাকি ?’

কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে কবি উপলব্ধি করেছেন ইতিহাসের অবিচারের কথা। এই সমস্ত সাধারণ মানুষের কথা ইতিহাসে নেই, থাকলেও তা প্রকৃত সত্য হিসেবে নেই। এইসব মানুষেরা সব দিক থেকেই রিক্ত। পৃথিবীর কেউ তাদের নিয়ে আগ্রহী নয়। কবি এখানেও লেখেন –‘আমাদের কথা কে বা জানে।‘

কিন্তু কবি তো আশাবাদী। তিনি উপায়হীন এই মানুষদের নিয়েই আশার আলো দেখার প্রত্যাশী। তিনি জানেন এই সঙ্কটে পারস্পরিক সহযোগিতার হাত মজবুত করতে পারলে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। তিনি বঞ্চিত মানুষদের পক্ষে থেকে তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে কবিতায় বঞ্চিত, নিঃস্ব মানুষদের সঙ্গে কবিও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!